‘আমরা আগে পুকুরে কোরাল মাছ চাষের কথা কোনোভাবে চিন্তাও করতাম না। কারণ কোরাল হলো রাক্ষসী মাছ। পুকুরে এক-দুটি কোরাল থাকা মানে অন্য সব মাছ শেষ। তবে আমি এই প্রথম পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবদুর রাজ্জাকের পরামর্শে আমার পুকুরে গত বছর কোরাল চাষ শুরু করি। তারা আমাকে থাইল্যান্ডের ৭ শতাধিক পোনা দিয়েছে। এখন আমার পুকুরের এক একটি কোরালের ওজন ৩ থেকে ৪ কেজি। আমি খাবার হিসেবে এসব কোরাল মাছগুলোকে গবেষকদের উৎপাদিত ফিড খাবার এবং বাজার থেকে কিনে আনা ফিড খবার দিয়েছি। আশা করছি ব্যাপক লাভবান হবো।’
কথাগুলো বলছিলেন পটুয়াখালীর মহিপুর থানার লতাচাপলী ইউনিয়নের মাইটভাঙ্গা গ্রামের মৎস্য চাষি আনোয়ার হোসেন।
দেশি প্রজাতির কোরালের খাবার তেলাপিয়া ও চিংড়িসহ অন্যান্য মাছ। মৎস্য চাষিরা ঘেরে বা পুকুরে কোরাল চাষ করলে অন্যান্য প্রজাতির মাছ খেয়ে সাবাড় করতো। ফলে চাষিদের লাভের বদলে গুনতে হতো লোকসান। তবে এই প্রথমবারের মতো রাক্ষসী এসব মাছ কৃত্রিম ফিড খাবারের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয়েছে পুকুরে।
জানা গেছে, এক বছর আগে উপকূল কুয়াকাটার পার্শ্ববর্তী লতাচাপলী ইউনিয়নের মাইটভাঙ্গা গ্রামের মৎস্য চাষি আনোয়ার হোসেন (৫০) নিজের ৩০ শতাংশ জমির মিঠা পানির পুকুরে কোরাল চাষ শুরু করেন। দীর্ঘ গবেষণার পর সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজের একদল গবেষক থাইল্যান্ড থেকে ৭ শতাধিক পোনা আমদানি করে এ মৎস্য চাষিকে সরবারহ করেন।
কোরাল মাছের খাদ্য হিসেবে দেওয়া হয়েছে গবেষকদের উৎপাদিত সিউইড সমৃদ্ধ কৃত্রিম ফিড খাবার। সঠিক পরিচর্চায় মাত্র ১ বছরের ব্যবধানে আনোয়ারের পুকুরের এক একটি কোরালের ওজন হয়েছে ৩ থেকে ৪ কেজি। এতে খুবই উচ্ছ্বসিত তিনি। তার দেখাদেখি এখন অনেকেই আগ্রহী হচ্ছেন কোরাল চাষে।
গবেষকরা জানিয়েছে, বর্তমানে কক্সবাজারেই উৎপাদন হচ্ছে এসব কোরাল মাছের পোনা। যে কেউ চাইলেই কক্সবাজার থেকে এসব কোরালের পোনা সরবরাহ করতে পারবে।
বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তরের সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড ফিশারিজ প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক শরিফুল আজম বলেন, দেশের উৎপাদিত পোনা মূলত তৈরি খাবার না খাওয়ার কারণেই থাইল্যান্ড থেকে এসব পোনা আমদানি করা হয়েছে। তবে দীর্ঘ গবেষণার পর কৃত্রিম খাদ্যের কোরালের পোনা বর্তমানে কক্সবাজারের কয়েকটি হ্যাচারিতেও উৎপাদিত হচ্ছে। চাষিরা চাইলে সেখান থেকেও কোরালের পোনা নিয়ে আসতে পারবে। উপকূলীয় এলাকায় আমরা ফিড খাবারের কোরাল চাষ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছি। এটির পোনা উৎপাদন থেকে শুরু করে বড় করা পর্যন্ত সফলতা পাওয়া গেছে।
মাইটভাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা মিজানুর রহমান রাসেল বলেন, আনোয়ার পুকুরে কোরাল চাষে ব্যাপক লাভবান হবেন। কারণ তার এক একটি কোরাল ৩ থেকে ৪ কেজি ওজন হয়েছে। এ জাতের পোনা পেলে আমরাও পুকুরে কোরাল চাষ করবো।
একই এলাকার বাসিন্দা আজিজুর রহমান লিটন মুন্সি বলেন, এটি আশ্চর্যের বিষয়। দেশি কোরাল কখনো ফিড খাবার খায় না। পুকুরের অন্যান্য মাছ খেয়ে কোরাল বেড়ে ওঠে। তবে আনোয়ার ভাই শুধু ফিড খাবার দিয়েই কোরাল বড় করে তুলেছেন। আমি পোনা সংগ্রহ করে পুকুরে এ জাতের কোরাল চাষ করবো।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক ও সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড ফিশারিজ প্রকল্পের প্রধান গবেষক ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, উপকূলীয় এলাকায় কৃত্রিম খাদ্যের মাধ্যমে কোরাল চাষ ছড়িয়ে দিতে দীর্ঘ গবেষণা করা হয়েছে। এমনকি এসব মাছের খাবার বিশ্ববিদ্যালয় বসেই মেশিনের মাধ্যমে উৎপাদন করা হয়েছে। এসব মাছের খাবারে সামুদ্রিক শৈবাল (সিউইড) ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাদেশে এই প্রথম সামুদ্রিক শৈবাল সহযোগে কৃত্রিম খাদ্যের মাধ্যমে থাইল্যান্ডের হ্যাচারিতে উৎপাদিত কোরাল মাছের চাষ পদ্ধতি নিয়ে তার দল কাজ করছেন।
পুকুরে ১ বছরে চাষ করে ২ থেকে ৩.৫ কেজি ওজনের হওয়ায় শুধু দক্ষিণাঞ্চল নয়, পুরো বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মৎস্যচাষিদের কাছে নতুন এক সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, তাদের উদ্ভাবিত সামুদ্রিক শৈবাল সহযোগে কৃত্রিম খাদ্যের মাধ্যমে কোরাল মাছ চাষ প্রযুক্তি বাংলাদেশে কোরাল মাছের উৎপাদন তথা বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদের উৎপাদন বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।