ডোনাল্ড জে ট্রাম্পের জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৪ জুন নিউ ইয়র্কে। জন্মস্থান কানাডা বলেও দাবি অনেকের। ব্যক্তিজীবন, রাজনীতি আর ব্যবসার উত্থানে চমক আর উত্তেজনায় ভরপুর ঘটনা যে কোনো সিনেমাকেও হার মানাবে। এই রিয়েল এস্টেট টাইকুনের বর্ণাঢ্য জীবন যেনো পরিপূর্ণ এক বিনোদন প্যাকেজ।
আগাগোড়া মারদাঙ্গা আর বিতর্কে মোড়ানো এক চরিত্র ডোনাল্ড ট্রাম্প। পেশিশক্তি প্রদর্শন আর উম্মাদনায় ভরপুর রেসলিং তো বটেই; রাজনীতির মঞ্চেও প্রতিপক্ষের আঘাতে হয়েছেন রক্তাক্ত। জনসভার মঞ্চ থেকে যেতে হয়েছে হাসপাতালের বেডে। দিয়েছেন প্রতিপক্ষকে দেখে নেয়ার হুমকি। কম যান না পাগলাটে সমর্থকরাও। এই ট্রাম্পের ডাকেই যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ হয় নজিববিহীন অঘটন। হামলা হয় পার্লামেন্ট ভবন-ক্যাপিটল হিলে। ঝরেছে রক্ত। গেছে প্রাণ। এতোকিছুর পরও কী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ের রেকর্ড গড়তে পারবেন এই রিপাবলিকান নেতা? নাকি বিতর্কের ভারেই চাপা পড়বে দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হবার খায়েশ?
২০১৬ সালে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়াটাও ছিলো যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির ইতিহাসে অনাকাঙ্ক্ষিত চমক। পোড় খাওয়া রাজনীতিবীদদের হিসাব নিকাশ আর ভবিষ্যতবাণী এলোমেলো করে ভোটযুদ্ধে হারিয়ে দেন প্রতিদ্বন্দ্বি ডেমোক্রেট নেত্রী হিলারী ক্লিনটনকে। এই বিজয়ে বিস্মিত আর অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন নিজেসহ গোটা নির্বাচনী প্রচার শিবির। যা সাংবাদিক মাইকেল উলফের লেখা ‘ফায়ার এন্ড ফিউরি: ইনসাইড দি ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ’ বইয়ে উঠে এসেছে।
সিরিয়া, ইয়েমেনসহ ৭টি মুসলিম দেশের অভিবাসন প্রত্যাশিদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকা নিষিদ্ধের বিতর্কিত পদক্ষেপ যেমন নিয়েছেন; তেমনি ইরাক আর আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ইতিবাচক সিদ্ধান্তও এসেছে তার শাসনামলেই। ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনের রাজধানী জেরুজালেমকে পাকাপোক্তভাবে ইসরাইলের মালিকানায় রেখে দিতে সেখানে চালু করেন মার্কিন দূতাবাস। আরব আমিরাত ও বাহরাইনের সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগটিও আসে তার তরফ থেকেই। একাধিক কৃষ্ণাঙ্গ যুবকের বিচারবহির্ভূত হত্যার ক্ষোভ দমনে প্রশাসনের কড়াকড়ি অবস্থানে তার আমলেই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে অধিকার আদায়ের আন্দোলন-“ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার।”
করোনায় ধুঁকতে থাকায় সারাবিশ্বে স্বাস্থ্যবিধি আর মাস্ক পরায় চরম কড়াকড়ির মধ্যে তা অমান্যই শুধু নয় বরং উৎসাহিত করেন ট্রাম্প। পুরানো শত্রু রাশিয়ার সাথে সুসম্পর্ক গড়ার ঝুঁকি নিয়েছেন। অপ্রত্যাশিত সফর করেছেন দুই কোরিয়ার সীমান্তবর্তী অসামরিক এলাকা। বৈঠক করেছেন উত্তর কোরিয়ার খ্যাপাটে সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের সাথে। সফর করেছেন আরেক শত্রু দেশ চীনে। ওই সফরে বৈঠক হয়েছে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে।
শৈশবে দুষ্টু প্রকৃতির ট্রাম্পকে বাগে আনতে ভর্তি করা হয় নিউ ইয়র্ক মিলিটারি একাডেমিতে। সেখানেই শেষ হয় হাইস্কুলের পর্ব। অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি নেন হোয়ার্টন বিজনেস স্কুল থেকে। লেখাপড়ার পাট চুকানোর আগেই বাবা ফ্রেড ট্রাম্পের প্রতিষ্ঠান “এলিজাবেথ ট্রাম্প অ্যান্ড সান”-এ শুরু হয় কর্মজীবন। বাবার পথ অনুসরণ করে রিয়েল স্টেট ব্যবসায় নামা ট্রাম্প দ্রুত শীর্ষদের কাতারে চলে আসেন। ১৯৭১-এ প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নাম বদলে রাখেন ”দ্য ট্রাম্প অর্গানাইজেশন”। ব্যবসার বিস্তার বাড়াতে বিনিয়োগ করেছেন হোটেল, ক্যাসিনো, গলফ ক্লাব, টেলিভিশন রিয়েলিটি শো’সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে।
ট্রাম্পের লিখিত বইয়ের সংখ্যা দেড় ডজনের মতো; বেশিরভাগই ব্যাবসা বিষয়ক। তার অভিনিত চলচ্চিত্র, টিভি সিরিয়াল ও মিউজিক ভিডিওর সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। পাঁচ সন্তানের জনক ট্রাম্পের বিয়ের সংখ্যা তিনটি। আগের দুই স্ত্রীর সাথে ছাড়াছাড়ির পর সবশেষ ২০০৫ সালে বিয়ে করেন মেলানিয়া ট্রাম্পকে।
ব্যক্তিজীবনে নারীঘটিত চটুল কাহিনীর জন্মদাতা ট্রাম্পের প্রেমিক হৃদয়ের রসায়ন ফাঁসকারীর সংখ্যা ডজন ছাড়িয়েছে। বেশিরভাগই যৌন হয়রানী আর আপত্তিকর সম্পর্কের কুপ্রস্তাব। বাদ ছিলেন না হলিউডের লাস্যময়ী অভিনেত্রী সালমা হায়েকও। ক্ষমতা ছাড়লে ফেঁসে যান পর্নো তারকা স্টর্মি ড্যানিয়েলসের সাথে আপত্তিকর সম্পর্ক গোপনের করতে ঘুষ দেয়া, কর ফাঁকি, রাষ্ট্রীয় গোপন নথি নিজের কাছে রাখা আর ক্যাপিটল হিলে হামলা মামলায়। ৩৪টি মামলায় ফৌজদারি অপরাধে তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে আদালত।
আগাগোড়া সমালোচনা, বিতর্ক আর অর্জনের জালে আষ্টেপৃষ্টে জড়ানো ধনকুবের ট্রাম্প দফায় দল পাল্টে অস্থিরতার নজিরও রেখেছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট ও রিপাবলিকান এই নেতা ২০০১ থেকে ৯ পর্যন্ত ছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বি ডোমেক্রেটিক পার্টির সমর্থক।